পর্ব ৫: মগধের রক্ততিলক ও এক রাজপুত্রের আগমন
ভূমিকা: চূড়ান্ত সংঘাতের লগ্ন
খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ থেকে ৬০০ অব্দ। ১৬টি মহাজনপদ তখন একে অপরের টুঁটি চেপে ধরেছে। কিন্তু এই দাবার বোর্ডে সেরা চালটি চালল মগধ। গঙ্গা, সোন আর চম্পা নদী দিয়ে ঘেরা এই জনপদটি ছিল প্রকৃতির এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। এখানকার মাটি ছিল উর্বর, আর জঙ্গল ছিল হাতিতে ঠাসা। কিন্তু সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা গাঢ় কালো লোহা। এই লোহাই মগধের রাজাদের হাতে তুলে দিল এমন এক অস্ত্র, যার সামনে তামা বা ব্রোঞ্জ ছিল খেলনা মাত্র।
১. বিম্বিসার: সাম্রাজ্যের প্রথম স্থপতি ও শয্যার কূটনীতি
মগধের সিংহাসনে বসলেন হর্যঙ্ক বংশের তরুণ রাজা বিম্বিসার। তিনি জানতেন কেবল তলোয়ার দিয়ে সব জয় করা যায় না। তাই তিনি বেছে নিলেন 'বিবাহ কূটনীতি'। তিনি কোশল রাজকন্যাকে বিয়ে করে যৌতুক হিসেবে পেলেন কাশীর মতো সমৃদ্ধ গ্রাম, যেখান থেকে বছরে এক লক্ষ মুদ্রা রাজস্ব আসত। এরপর লিচ্ছবি আর মদ্র দেশের রাজকন্যাদের বিয়ে করে নিজের সীমানা সুরক্ষিত করলেন।
বিম্বিসারের প্রথম বড় সামরিক অভিযান ছিল প্রতিবেশী 'অঙ্গ' রাজ্য (বর্তমান ভাগলপুর) দখল করা। এই জয়ের ফলে মগধের হাতে এল চম্পা বন্দর, যা দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে বাণিজ্যের দরজা খুলে গেল। মগধের কোষাগার উপচে পড়ল স্বর্ণমুদ্রায়।
২. হারানো স্বাধীনতা ও নগর জীবনের বিড়ম্বনা
সাম্রাজ্য যখন বাড়ছে, সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা তখন কমছে। বিম্বিসারই প্রথম ভারতে এক শক্তিশালী গুপ্তচর বাহিনী গড়ে তোলেন। সাধারণ মানুষের ঘরে, মদের দোকানে বা হাটে-বাজারে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াত রাজার চরেরা। রাজদ্রোহের সামান্যতম আভাস পেলেই চলত অকথ্য নির্যাতন।
রাজগৃহ তখন পাথরের বিশাল দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সেই শহরের ভেতরটা ছিল ঘিঞ্জি, নালাগুলো দুর্গন্ধে ভরা। মানুষ তখন প্রকৃতির থেকে দূরে সরে গিয়ে এক কৃত্রিম যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছিল। উচ্চবর্ণের বিলাসিতা আর নিম্নবর্ণের হাহাকার শহরগুলোকে স্পষ্ট দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছিল।
৩. ধর্ম যখন মৃতদেহ: যজ্ঞের বীভৎস রূপ
বিম্বিসারের যুগে যজ্ঞের নামে উন্মাদনা চরমে পৌঁছাল। যজ্ঞশালাগুলো তখন কসাইখানার রূপ নিয়েছে। এই রক্তপাত দেখে একদল তরুণ রাজপুত্র এবং সাধারণ মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে তুললেন। তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে বনে চলে গেলেন সত্যের সন্ধানে। এদের বলা হতো 'শ্রমণ'। তারা বেদকে অস্বীকার করলেন, দেবতাদের প্রাধান্য মানতে চাইলেন না। তারা বললেন, "মানুষের মুক্তি যজ্ঞের রক্তে নেই, আছে নিজের কর্মে।"
৪. কপিলাবস্তুর সেই রহস্যময় উদ্যান
ঠিক এই সময়েই উত্তর ভারতের হিমালয়ের পাদদেশে শাক্য বংশের ছোট এক রাজ্য কপিলাবস্তু। সেখানে রাজা শুদ্ধোদন আর রানী মায়াদেবী একটি সন্তানের জন্য ব্যাকুল। রানী মায়াদেবী স্বপ্নে দেখেছিলেন একটি শ্বেত হস্তী তার গর্ভে প্রবেশ করছে। জ্যোতিষীরা গণনা করে বললেন, "এই শিশুটি হয় হবে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট (চক্রবর্তী রাজা), নয়তো হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্ন্যাসী।"
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৬৩ অব্দ। বৈশাখী পূর্ণিমার দিন। লুম্বিনীর শাল গাছের তলায় রানী মায়াদেবী জন্ম দিলেন এক পুত্রসন্তান। নাম রাখা হলো— সিদ্ধার্থ।
৫. এক অজানা সমাপতন: তলোয়ার বনাম অহিংসা
ইতিহাসের কী অদ্ভুত খেলা! একদিকে মগধের বিম্বিসার আর তার পুত্র অজাতশত্রু তলোয়ার শান দিচ্ছেন পুরো ভারত দখল করার জন্য। আর অন্যদিকে কপিলাবস্তুর রাজপ্রাসাদে বড় হচ্ছেন এক কিশোর, যিনি একদিন এই রক্তারক্তির উত্তর দেবেন এক চরম শান্তিতে।
বিম্বিসার বৌদ্ধধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেও তার পুত্র অজাতশত্রু ছিলেন ক্ষমতার অন্ধ পূজারী। সিংহাসনের জন্য তিনি তার নিজের পিতাকেই কারাগারে বন্দি করে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। এই পিতৃহত্যার রক্ত মগধের ইতিহাসে চিরকালের জন্য এক কলঙ্ক লেপে দিল।
ঐতিহাসিক দলিল: হর্যঙ্ক বংশের ইতিহাস ও মহাবংশ।